এক শিক্ষার্থীর জন্য ১৯ শিক্ষক কর্মচারীর মাসে বেতন সাড়ে ৪ লাখ টাকা

- আপডেট সময় : ০১:১৫:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৫৫০ বার পড়া হয়েছে

সারি সারি বেঞ্চে সাজানো শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু সেখানে শিক্ষার্থী মাত্র একজন। হাতে বই নিয়ে একা বসে শিক্ষকের অপেক্ষা করছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি আক্তার। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে আসেননি। পাশের কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে গল্প-আড্ডায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। অন্য একটি কক্ষে এক শিক্ষিকা নিজের শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছেন। পাশে থাকা অন্য শিক্ষিকারা ব্যস্ত ছিলেন পারিবারিক আলাপচারিতায়।
এমন চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ মৌজার হাসারপাড় বড়বাড়ী গ্রামের বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায়। মাদ্রাসার নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত। এখানে শিক্ষক রয়েছেন ১৪ জন এবং কর্মচারী পাঁচজন। অর্থাৎ মোট জনবল ১৯ জন। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী রয়েছে ১৮৮ জন। তাদের বিপরীতে প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা বাবদ দেওয়া হচ্ছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৪ টাকা।
নথিতে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পঞ্চম শ্রেণিতে ২২ জন, ষষ্ঠে ২৪, সপ্তমে ২৭, অষ্টমে ৩৪, নবমে ৪১ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে সরেজমিনে অষ্টম শ্রেণির বৃষ্টি আক্তার ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়নি। বৃষ্টি আক্তার বলেন, প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় আসে। তবে ক্লাস বেশি হয় না। এ কারণে শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত আসে না।
শুধু উপস্থিতি নয়, মাদ্রাসাটির সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের দাখিল বা এসএসসি সমমান পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৩১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও পাস করেছে মাত্র দুজন। স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম অভিযোগ করেছেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হলেও দাখিল পরীক্ষার সময় হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। তাদের অটোভাড়া, খাবার ও পকেট খরচ দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি।
সাবেক শিক্ষার্থী সাগর ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা থেকে পাস করার পর তিনি অন্যের হয়ে তিনবার প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছেন এবং এজন্য অটোভাড়া ও পকেট খরচ দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মাদ্রাসাটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আরও শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএতে শূন্য পদের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তিও পায়।
শিক্ষার্থী কম থাকার কারণ হিসেবে মাদ্রাসার সহকারী সুপার আব্দুস সুবহান তিস্তা নদীর পাশের এলাকা এবং হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। মাদ্রাসা সুপার শাহ আলম বলেন, আশপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় আসে না। হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থী গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল বলেও দাবি করেন তিনি। মাদ্রাসার শিক্ষক সামছুল হকের ভাষ্য, মাদ্রাসাগুলোতে এমনিতেই শিক্ষার্থী কম।
মাদ্রাসার সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. লাল মিঞা সরকার জানান, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি তিনি জানেন। আগামীতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মাদ্রাসামুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, এক-দুই দিনের মধ্যে মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করানো হবে। কোনো সমস্যা পাওয়া গেলে প্রতিবেদন পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

























