আব্দুল হালিম, রংপুর অফিসঃ
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১ নং খোড়াগাছ ইউনিয়নের অন্তর্গত রূপসী একটি বর্ধিঞ্চু, সমৃদ্ধ ও আদর্শ গ্রাম। সামাজিক অবক্ষয় যখন দেশব্যাপী নেমে এসেছে বিভিন্ন অপরাধের অপশক্তির রোগ জীবাণু। ঠিক তখনি রূপসী নামক একটি আদর্শ গ্রামে ১৯৯৪ সালে জন্ম হয়েছিল সামাজিক অবক্ষয় ও গরু চুরি প্রতিরোধ কমিটি। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ১ নং খোড়াগাছ ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও রূপসী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আজগার আলী এবং সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল হালিম সহ ১১ সদস্য বিশিষ্ট ব্যক্তির নেতৃত্বে এই সামাজিক অবক্ষয় ও গরু চোর প্রতিরোধ কমিটি । বর্তমানে এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। গ্রামের শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তারা নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমাতে পারছে। গরু চোরের উপদ্রপ থেকে তারা রক্ষা পেয়েছে। কিন্ত অপরদিকে এই কমিটির উদ্যোক্তরা হারিয়েছে তাদের জীবনের নিরাপত্তা। বার বার তাদের জীবনে নেমে এসেছে প্রাণ নাশের হুমকি। তবুও এ কমিটি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও গ্রামের সাধারণ মানুষের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে এখনও তাদের অগ্রাভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রায় ২ শত বর্গমাইল আয়তন বিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম উপজেলা মিঠাপুকুর। এই উপজেলার উত্তর -পশ্চিম দিকে ১ নং খোড়াগাছ ইউনিয়ন উপজেলা কেন্দ্র থেকে কমপক্ষে ২০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। ইউনিয়নটির পশ্চিম দিকে বদরগন্জ ও উত্তর দিকে কোতয়ালী থানা, দক্ষিনে পীরগন্জ ও নবাবগন্জের শেষ সীমানা। ৪ টি থানার শেষ সীমানায় অবস্থায় হেতু এই ইউনিয়নে গরু চুরির হিড়িক বেশী। এ এলাকায় গরু চুরি ছাড়াও মদ, জুয়া ইয়াবা, হিরোইন ও অন্যান্য অসামজিক কার্যকলাপের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছিল। সন্ধা হলেই হাটে বাজারে, পথে ঘাটে স্কুলের মাঠে মদ্যপদের উপদ্রপে কোন ভদ্র লোক তাদের সামনে দিয়ে পথ চলতে পারতনা। কৃষক শোয়ার ঘর ছেড়ে গরু চুরির ভয়ে গোয়াল ঘরে গিয়ে রাত্রী যাপন করত। মশার সঙ্গে মিতালী করেই তাদের সারারাত কাটতো। কেউ কেউ গরুর সঙ্গে নিজকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে ঘরের পাশে ঘুমাতো। এর পরেও গরু চুরি হতো, চোরাই গরুকে জিম্মি রেখে গরু চোরের প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে ১০/ ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ফেরৎ দিত। গরু চোরদের
ও আবার নির্দিষ্ট কিছু দালাল থাকে। সেই দালাল ছাড়া চোরাই গরু উদ্ধার করা সম্ভব হতোনা। দালারেরাই চোরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গরুর বিক্রয় মূল্যে অনুসারে চোরাই গরুর বিনিময় মূল্য নির্ধারণ করে গরুর মালিককে জানিয়ে দিতো। গরুর মালিক২৫/৩০ হাজার টাকা দামের গরু ১০/১৫ হাজার টাকা দন্ড দিয়ে চোরদের কাছ থেকে ফেরৎ নিতে হতো। তাদের ধারণা থানা পুলিশ করলে আর গরু উদ্ধার করা যাবেনা। আর এ কারণে চোরদের হয় পোয়াবারো। গরু চুরি বন্ধের সঠিক কোন নিশানা খুজে পেতনা পুলিশ প্রশাসনও। গরু চোররা চোরাই গরু মালিকের হাতে টাকার বিনিময়ে সরাসরি ফেরৎ দিতোনা। দালালের হাতে টাকা নিয়ে গরু জঙ্গলে অথবা রাতে খোলা মাঠে ছেড়ে দিতো। গরুর মালিক দালালদের হাতে উপকৃত হয়ে তাদের নাম জনসম্মুখে প্রকাশ করতে চায়না। এ যেন বড় বড় শহরের বড়লোকদের ছেলেকে চুরি করে জিম্মিকরে ধরে রেখে টাকা আদায় করার মত। তফাৎ শুধু সেখানে ছেলে ধরারা টাকা আদায় করে টেলিফোনে আর গ্রামে গরু চোরেরা দালালদের মাধ্যমে। যে গরু উদ্ধার হয়না বা হাটে বাজারে বিক্রি হয়না তা কসাইদের নিকট বিক্রয় করা হত। কসাইরা বিভিন্ন হাটের মিথ্যা রশিদ দেখিয়ে গরু জবাই করে মাংস হাটে বিক্রয় করে দিত। এক সময় এমনি ছিল ১ নং খোড়াগাছ ইউনিয়নের গরু চোরদের উপদ্রব। যেখানে প্রতিমাসে ৩০ থেকে ৪০টি গরু মহিষ চুরি যেত।এমন অবস্থায় রূপসী গ্রামবাসী অতিষ্ঠ হয়ে ১৯৯৪ সালে ২৭ মে এ প্রতিবেদক, সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল হালিম এঁর নেতৃত্বে গরু চোর পাকড়াও অভিযান শুরু করেন গ্রামবাসী। ওই দিনই এলাকার কুখ্যাত গরু চোর বেনজিরকে ধৃত করে থানায় সোপর্দ করা হয়। পরবর্তীতে এলাকাবাসী মদপানকারি, জুয়াড়ু ও গরু চোরদের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মিঠাপুকুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা (ওসি) কাজী নাজমুল হক ও এসপি মাবুদ এঁর নিকট সহায়তা কামনা করলে ১৯৯৪ সালের ৩রা জুলাই রূপসী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে গরুচুরি প্রতিরোধ এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হকের উপস্থিতিতে ১ নং খোড়াগাছ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও রূপসী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আজগর আলীকে সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল হালিমকে সাধারণ সম্পাদক করে ১ নং খোড়াগাছ ইউনিয়ন সামাজিক অবক্ষয় ও গরু চুরি প্রতিরোধে ১১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সেই থেকে এ যাবৎ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় উক্ত কমিটি ইউনিয়নে সমস্ত অসামাজিক কার্যকলাপ ও গরু চুরি বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।
উক্ত কমিটি ১৩৩ টি চোরাই গরু উদ্ধার করে গরুর প্রকৃত মালিকদেরকে ফেরৎ দিয়েছে এবং ১৮টি চোরাই গরু রাখার বাংকার ভেঙ্গে দেয়া হয়। একএকটি বাংকারে ১১/১২ টি করে চোরাই গরু থাকত। ও ছাড়াও কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষীতে ২৯ জন গরুচোর জেলহাজত বাস করেন। অবশিষ্ঠ গরুচোর আত্ম সমর্পন করে চুরি পেশা থেকে অব্যাহতি নেন। এদেরই একজন মহুবার রহমান বাবলু। সামাজিক অবক্ষয় ও গরু চোর প্রতিরোধ কমিটির সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক হালিমকে সে বারবার হুমকি দিয়ে আসছিল।গত ১৯৯৪ সালের ৫ ই ডিসেম্বর তারিখ গরুচোর বাবলু ও তার দল বল নিয়ে শ্যামপুর রেলওয়ে স্টেশনে এ প্রতিবেদক সাংবাদিক আব্দুল হালিমকে আটক করে মারধর করে এবং একটি মাইক্রো ক্যাসেট সনি নং ৬৪০ ও ৪০০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে আব্দুল হালিম রংপুর ১ম শ্রেণীর মেজিষ্ট্রেট কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। সামাজিক অবক্ষয় ও গরু চুরি প্রতিরোধ
কমিটিকে পত্রিকায় লেখনির মাধ্যমে যারা সহযোগীতা করেছেন তারা হলেন, মৃত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা আলী আশরাফ, সাংবাদিক আরিফুল হক রুজু, মৃত মানিক সরকার মানিক, মৃত সাংবাদিক শাহজাদা মিয়া আজাদ, সাংবাদিক আবু তালেব, সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম রফিক, সাংবাদিক আফতাব হোসাইন,
সাংবাদিক মোজাফ্ফর হোসেন,সাংবাদিক মাহবুবার রহমান হাবু,সাংবাদিক লিয়াকত আলী বাদল, দৈনিক দাবানল সম্পাদক মরহুম খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল, হালিম আনছারী ও পীরগন্জ প্রেস ক্লাব সভাপতি মৃত মোকছেদ আলী সরকার প্রমুখ। পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে যারা সহযোগীতা করেছেন, তারা হলেন, আইজিপি শহীদুল হক, সিআইডি এসপি এম এ বাতেন, এসপি মাবুদ, এসপি নাঈম, ডিআইজি আব্দুর রাজ্জাক, ওসি কাজী নাজমুল হক, এস আই মফিজ, বর্তমান এসপি আবু সাইম ও ওসি আবু বক্কর সিদ্দীক। জীবনের হুমকির মুখে থেকেও খোড়াগাছ সামাজিক অবক্ষয় গরু চোর প্রতিরোধ কমিটির সদস্যবর্গ তাদের অগ্রাভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।













