মোঃ আফজাল হোসেন, দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ
দেশের উত্তর অঞ্চলের বড়পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক ৫২৫ মেগাওয়াট তাপ
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষম দুটি ইউনিটই বিকল হয়ে পড়ায়
বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এরফলে উত্তরাঞ্চলের
জেলাগুলিতে ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে। কোথাও এক ঘন্টা পর পর
আবার কোথাও ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং চলছে। এতে করে
জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তিনটি
ইউনিট রয়েছে। এরমধ্যে ১নং ও ২নং ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১২৫
মেগাওয়াট করে ২৫০ মেগাওয়াট এবং ৩নং ইউনিটের উৎপাদন
ক্ষমতা ২৭৫ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় ২নং
ইউনিটটি ৭ বছর ধরে বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। ২০২০ সালের নভেম্বর
যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়ে ২নং ইউনিটটি বন্ধ হয়ে গেলেও তা
মেরামতের কার্যকর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ইউনিটের
যন্ত্রপাতিগুলি নষ্ট হয়ে গেছে। বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র
কর্তৃপক্ষ, পিডিবি এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ
মন্ত্রণালয়। সেই থেকে ১নং ও ৩নং ইউনিট চালু রেখে ৪০০
মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে দুটি ইউনিটে ২৬০-২৮০
মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছিল।
গত বছরের অক্টোবর /২০২৫ থেকে ৩নং ইউনিটটি বন্ধ রয়েছে।
বর্তমানে ৩ নং ইউনিটটির ওভারহলিং চলছে। সেই থেকে ১নং
ইউনিটি খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছিল। গত বুধবার (২২ এপ্রিল)
দিবাগত রাতে কোল মিলে সমস্যা দেখা দিলে ১ নং ইউনিটটিও
বন্ধ হয়ে যায়। এরফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন
পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
বড়পুকুরিয়া খনি থেকে উৎপাদিত কয়লা দিয়ে ৫২৫ মেগাওয়াট
বড়পুকুরিয়া কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম
চালিয়ে আসছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারবিন
ইন্টারন্যাশনাল। পাঁচ বছরের চুক্তি মোতাবেক এ বছর তাদের মেয়াদ
শেষ হবে। চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদন সচল রাখতে ছোট ধরনের মেরামত
ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের কথা থাকলেও তারা কিছুই করেনি ঠিকাদারি
প্রতিষ্ঠানটি বলে অভিযোগ রয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে মেরামত
করায় বার বার ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের প্রতিটি
ইউনিট সচল রাখতে প্রয়োজন হয় দুটি করে ইলেকট্রো
হাইড্রোলিক অয়েল পাম্প। যা ওই ইউনিটের জ্বালানি হিসেবে
তেল সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখে; কিন্তু ২০২২ সাল
থেকে ৩নং ইউনিটের দুটির মধ্যে একটি পাম্প নষ্ট। যে কোনো
সময় বন্ধের ঝুঁকি নিয়ে একটি ইলেকট্রো হাইড্রোলিক অয়েল
পাম্প দিয়ে ৩নং ইউনিটের উৎপাদন কার্যক্রম চলে আসছিল। ফলে
মাঝে মধ্যেই যান্ত্রিক ক্রটি দেখা দিয়ে ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়।
একাধিকবার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি অবগত করলেও তারা
অজ্ঞাত কারণে তা আমলে নেয়নি।
বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আবু বক্কর
সিদ্দিকের ভাষ্য, কোল মিল মেরামত করে ১নং ইউনিটটি চালু করতে
কমপক্ষে ৪/৫দিন সময় লাগবে। আর ৩ নং ইউনিটটি ওভারহলিং শেষে
আগামী মাসের (মে ২০২৬) মাঝামাঝিতে উৎপাদনে যেতে পারে
বলে জানান।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির
উৎপাদিত কয়লা নিয়ে বিপাকে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। কয়লা সংরক্ষণের
জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে। খনির কর্মকর্তারা জানান,
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই কয়লার একমাত্র ক্রেতা বড়পুকুরিয়া
তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিন্তু কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় উৎপাদিত কয়লা
ব্যবহার করা যাচ্ছে না। খনিতে কয়লা রাখার আর কোন জায়গা নেই।
প্রতিদিন কয়লাতে আগুন ধরছে। এমনকি এখানে বড়ধরনের
দূর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
হিসাব অনুযায়ী, তিনটি ইউনিট একসঙ্গে চালাতে প্রতিদিন
প্রায় ৫ হাজার ২০০ টন কয়লা প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে
ইউনিটগুলো একসঙ্গে চালু না থাকায় কোল ইয়ার্ডে বিপুল
পরিমাণ কয়লা জমে গেছে। এতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা নিয়েও শঙ্কা
তৈরি হয়েছে।
বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড
(বিসিএমসিএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী
মো. শাহ আলম জানান- বর্তমানে খনিতে প্রতিদিন গড়ে ২
হাজার ৭০০ টন কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। খনির ইয়ার্ডের
ধারণক্ষমতা ২ লাখ ২০ হাজার টন হলেও বর্তমানে মজুত বেড়ে প্রায়
সাড়ে ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ইয়ার্ডে আর জায়গা না থাকায়
বিকল্প স্থানে কয়লা সংরক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও
উত্তরাঞ্চলের চাহিদা পূরণে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় এবং সরবরাহ
ঘাটতির কারণে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। এক সপ্তাহ ধরে
৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তীব্র গরমের মধ্যে
সকাল, ভোর ও গভীর রাতে দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট চলছে। দ্রুত
প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের
৩টি ইউনিট সচল না করলে ভয়াবহা বিদ্যুৎ সংকটে পড়বে ৮টি
জেলা।













